১
কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের নিথর গাছগাছালি চিরে চলে যাওয়া রেললাইনের পাতে জমে থাকা মিহি শিশিরকণা আর তার সমান্তরাল চরিত্রের সঙ্গ দেয়া এক ভাঙা চায়ের দোকানের জ্বলজ্বলে উনুনের উপর চাপানো কেটলি হতে শো-শো শব্দে বের হওয়া তপ্ত বাষ্প আবছা করে তুলছে সম্মুখের দৃশ্যপট। লিকারের গন্ধে কিঞ্চিত বিষণ্ণ দূরবর্তী মন আর বিন্দুতে মিলন-প্রত্যাশী রেল-পাতের প্রতি কেন্দ্রীভূত দৃষ্টি। টুকরো কাগজের নিভু-নিভু অঙ্গারের পাশে লেজ গুটিয়ে শুয়ে থাকা উত্তাপ পোহানো লোমছাড়া কুকুরের উদাসী চাহনি দেখে আকৃষ্ট কঞ্চির বেড়ার ফাঁকে অবস্থানরত এক ডাঁসা পিঁপড়ে। কাঠের বেঞ্চির তলায় ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে থাকা এক বেড়াল চমকে উঠে ভোর-রাত্রির আঁধার ফুঁড়ে এগিয়ে আসা ক্রিং-ক্রিং শব্দ শ্রবণে। মনুষ্য কর্মচাঞ্চল্য শুরু হতে কিঞ্চিত দেরি আছে এখনো। জড়ানো পশমের চাদরখানি আরও আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে এক ঐন্দ্রজালিক আচ্ছন্নতায় নিমগ্ন আত্মপ্রকৃতি হঠাৎ ঘটনাসমূহের যোগসূত্র টানতে চায় সামগ্রিকভাবে। আর তারমাঝেই চেতনা-অনুভূতিগুলোর ধূসর পরিভ্রমণ অতীত-বর্তমানের তেপান্তরে।
বাপজান! রেইড কি জিনিস!
গরম পানিতে ছোট্ট হাত ডুবিয়ে কাপ-পিরিচ ধৌতকৃত বালকের নিষ্পাপ জিজ্ঞাসার সামনে পান খাওয়া দাঁত কেলানো তাচ্ছিল্যের হাসি এক প্রৌঢ়ের। ঘনীভূত দুধের ডিব্বার ছিদ্রান্বেষণে ব্যস্ত দ্বিধা-বিভক্ত পিতা।
তুই এখনু ছুড! এইগুলান্ বুজবি না!
কাঁচের গেলাসে বালকের রহস্যময় চাহনির প্রতিফলন।
কবে বুঝমু বাপজান!
সময় অইলেই .....
একাগ্র চিত্তে অপেক্ষমাণ বালকের অবধারণ। সময় কবে আসবে! ভাঁজ পড়া কপালে রহস্যময়তার হাতছানি তবে তার ঠোঁটের কোনার মৃদুহাসি বয়োজ্যেষ্ঠ পিতার চোখ এড়িয়ে গেছে হয়তো। মহাকাল বিনয়ী। অকালিক। কিঞ্চিত উন্মোচিত রহস্যে বালকের প্রতিক্রিয়া অবলোকনে তার আত্মতুষ্টির প্রচেষ্টা।
২
ফিন্ফিনে পাতলা কাপড়। তড়িঘড়ি পোশাক-পরিচ্ছদ। আর ওষ্ঠের লেপ্টানো রঙ। যে রঙ শুধু থেঁৎলানোর জন্য, লেপটানোর জন্য। দেহবল্লরীর ভাঁজ চষে বেড়ানো কনকনে শীতল হাওয়ার ধীর-স্থির উষ্ণতায় রূপান্তর। হিম হিম এই শীত-ভোরে আঁচ পোয়ানো যাবে রূপান্তরিত সেই উষ্ণ বায়ুতে। সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মোটা-খাটো-পাতলা-চিকন মাংসপিণ্ড। সভ্যতার ভাগাড়। অবদমিত সামাজিক কামভাবের প্রশমন তাঁদেরই যোনিচিহ্নে। সভ্যতার মুক্তি। নোংরা গলির অন্ধকারেই সমাজ পাপমুক্ত হয়। আর যারা তা বহন করে বেড়ায় তাঁদের ঘাড়েই নখ-দন্তের গদ্গদে দাগ। পাতলা ওড়নার ফাঁক গলে দৃশ্যমান চাঁদের কলঙ্ক। গুটিসুটি জড়সড় অসহায় মাংসপিণ্ড। ভোরের এই শুভ্র আলো তোমাদের কপাল ঠিকরে প্রতিফলিত। তোমরা কি উচ্চবোধশক্তি মানবসত্তার পাপ বহনে কালচে হয়ে গেছো? তোমরা কি অকৃতজ্ঞ এই সমাজের পথ দিয়েই তাই হেঁটে যাও দুলকি চালে? রঙ্গ-রসে? তাড়ি খাওয়া ঢিমে তালে? অভিজাত কোট-পকেটের নাক-মোছা রুমাল তোমরা। আর নিম্নবিত্তের গামছা। তাদের রোমাঞ্চ। বাঁধনহারা কল্পনা। অপ্রত্যাশিত সূর্যোদয় অবলোকনে তোমরা কি স্মৃতিকাতর তোমাদের সেই লাল-নীল আলোর নক্ষত্রখচিত প্রমোদোদ্যানের বিরহে?
৩
সূর্য উঠছে। বাতাসে লিকারের কড়া গন্ধ। ধোঁয়া উঠা রঙ-চা। কুয়াশাচ্ছন্ন পথ। নিথর গাছগাছালি চিরে চলে যাওয়া রেললাইনের পাতে জমে থাকা মিহি শিশিরকণাগুলো এখনও সজীব।
শুধু কাঠের বেঞ্চির তলায় ঢুলুঢুলু চোখের বেড়ালটি এখনও ঝিমুচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



